হাজার বছরের পুরোনো সেই রাত: সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয়, প্রকৃতির নীরব কথা

ভ্রমণ স্থানঃ চার কুকরি মুকরি- নারিকেল বাগান

ভ্রমণসঙ্গিঃ Kazi Rakibul Hasan, Md Abdullah Al Noman, Tuba Binte Rihana Alam, Afrin Tandia, Meri Na

চর কুকরি-মুকরি সম্পর্কে না বললেই নয়। তাই বিস্তারিত শুরু করার আগে চলুন একটু জানি এই দ্বীপ সম্পর্কে, তারপর শেয়ার করবো আমাদের ভ্রমণের পুরো অভিজ্ঞতা।

Picture1

চর কুকরি-মুকরি: নারিকেল বাগান, বন্যপ্রাণী আর শান্তির দ্বীপ ( ২১.৯৩৫১° উত্তর ৯০.৬৪০৬° পূর্ব )

বাংলাদেশের ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার দক্ষিণে, মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের কোলে অবস্থিত চর কুকরি-মুকরি। এই দ্বীপকে প্রায় সবাই ‘দ্বীপকন্যা’ নামে ডাকে, আর ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এটি প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগের এক আদর্শ গন্তব্য।

দ্বীপের সবুজ বন, কেওড়ার গন্ধ আর শান্ত সমুদ্র সৈকত মুহূর্তেই মনকে খোলা আকাশের মতো প্রশান্ত করে। এখানে চিত্রা হরিণ, বানর, বন্য মহিষ, শিয়াল, বন বিড়াল, বন মোরগসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী শান্তিতে ঘুরে বেড়ায়। প্রায় ৮,৫৬৫ হেক্টরের বনভূমির মধ্যে ২১৭ হেক্টর এলাকা সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে রক্ষিত। এক সময় এই চরে অনেক বেশি কুকুর ও ইঁদুর বিচরণ করত বলে স্থানীয়দের কাছে এটি চর কুকরি-মুকরি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে

চর কুকরি-মুকরিতে ভ্রমণ মানে শুধু পাহাড়-সমুদ্র নয়, বরং নদীপথে লঞ্চে যাত্রা, নারিকেল বাগানে গিয়ে নিঃশব্দ সময় কাটানোর আনন্দ। দিনের আলোতে সবুজ বন, সন্ধ্যায় সোনালী সূর্যাস্ত আর রাতের নীরবতা—সবকিছু মিলিয়ে এই দ্বীপ যেন প্রকৃতির সঙ্গে এক বিশেষ প্রেমের গল্প।

যদি আপনি শান্তি, সবুজ আর প্রকৃতির নৈসর্গিক অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, চর কুকরি-মুকরি নিঃসন্দেহে সেই জায়গা।

আমি চেষ্টা করব আপনাদের খুব সুন্দরভাবে আমাদের এই ভ্রমণ কাহিনি শেয়ার করতে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল পরিবার নিয়ে দু:সাহসিক ভ্রমণ উপভোগ করা। তাই আমরা পরিকল্পনা করেছি চার কুকরি-মুকরি নারিকেল বাগানে দুই রাত কাটানোর। আমরা মোট তিনটি পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম। মোট ৬ জন বড় এবং ৪ জন শিশু ছিল আমাদের দলে। দুই রাতের জন্য যা যা লাগবে—খাবার, রান্নার উপকরণ, তাঁবু, লাইট, পানি সবই আমরা সাথে নিয়েছিলাম। আমরা ঢাকা থেকে রান্নার উপকরণ সব নিয়েছিয়াম। এর মধ্যে ছিল চাল, ডিম, তেল, ডাল, মসলা, তাজা সবজি এবং আরও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। সবকিছু রওনা দেওয়ার দুই দিন আগে থেকে আমরা প্যাকিং শুরু করি, যাতে যাত্রার সময় কোন ঝামেলা না হয়। এবার আসা যাক আমাদের ভ্রমণের বিস্তারিত অভিজ্ঞতার কথায়—যাত্রাপথ, নৌকা ভ্রমণ, তাঁবু স্থাপন, রান্না, বন আর সমুদ্রের মাঝে কাটানো সময় এবং সেইসব মুহূর্ত, যা আমাদের দুই রাতের পিকনিককে এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।

১৩ ডিসেম্বর ২০২৫: বিকেল ৩:৩০ টায় আমরা লঞ্চ ঘাটে পৌঁছালাম। কর্ণফুলী-১১ লঞ্চে আমাদের জন্য তিনটি কেবিন ভাড়া করি, যাতে যাত্রার সময় সবাই শান্তভাবে ঘুমাতে পারে। যাত্রাপথ বেশ দীর্ঘ, তাই আমরা সবাই প্রস্তুত ছিলাম আর অপেক্ষায় ছিলাম রাতের জন্য। লঞ্চ যাত্রা শুরু হলো সন্ধ্যা ৮ টায়। প্রথম ঘন্টা আমরা গল্প করি, পরপর হাসাহাসি আর কোথায় কী করব সব পরিকল্পনা করি। রাতের খাবারের জন্য বাসা থেকে সঙ্গে আনা গরুর তেহেরি খেয়েছিলাম, যা আমাদের পুরো রাতে শক্তি জোগায়। খাওয়ার পর আবার কিছুক্ষণ গল্প করি, আর এরপর সবাই ধীরে ধীরে নিজের কেবিনে গিয়ে ঘুমোতে যাই।

১৪ ডিসেম্বর ২০২৫: ভোর ৫টায় আমরা বেতুয়া লঞ্চ ঘাটে পৌঁছালাম। এরপর অটো রিকশা নিয়ে কচ্ছপিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করি। প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে আমাদের সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। কচ্ছপিয়া ঘাটে পৌঁছে আমরা সকালের নাস্তা করি ভাত, ইলিশ মাছ ভাজা, আলু ভর্তা আর ডাল দিয়ে। নাস্তা শেষে পাশের বাজার থেকে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মুরগি, কেরোসিন তেল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নি। এরপর শুরু হলো আমাদের মূল যাত্রা। আমরা একটি নৌকা ভাড়া করি, যা আমাদের চার কুকরি-মুকরি নারিকেল বাগানে পৌঁছে দেবে। নারিকেল বাগান পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই ঘণ্টা। দুপুর ১২টার মধ্যে আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছাই। ঘাট থেকে প্রায় ১.৫ কিলোমিটার দুরে আমরা তাঁবু স্থাপন করি। মোট ৪টি তাঁবু, ৩টি পরিবারগুলোর জন্য এবং ১টি বাজার ও ব্যাগ রাখার জন্য। সব কাজ শেষ হলে আবার ১.৫ কিমি হাঁটাপথ পারি করে নলকূপে চাল ও মুরগি ধুয়ে রান্নার জন্য প্রস্তুত করি। এরপর তাঁবুর কাছে লাকড়ির চুলা বানাই, আগুন জ্বালাই এবং রান্না শুরু করি। রাতের খাবারে খিচুড়ি ও মুরগি রান্না করি। রাতের আকাশ সত্যিই মনোমুগ্ধকর। তাঁবুর পাশের আগুনের আলোয় আমরা শুয়ে শুয়ে তারা দেখি। আকাশে শুটিং স্টারও চোখে পড়ে প্রায় ৩০–৪০টি। শিয়ালের ডাক শুনে আমরা টর্চ জ্বালিয়ে সতর্ক করি, যাতে তারা আমাদের কাছে না আসে। রাত ৩টা পর্যন্ত তারা ও গল্পের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আমরা ধীরে ধীরে ঘুমাতে যাই।

১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫। ভোরে ঘুম ভেঙে উঠেই সকালের রান্না বসাতে হবে। সকালের জন্য বানালাম ভাত আর ডিম-আলুর ঘাটি। সবাই মিলে খুব আনন্দ করে খেলাম। দুপুরের ব্যবস্থাটা ভাবিদের হাতে সঁপে দিয়ে আমরা সবাই একটু ঘুমিয়ে নিলাম হেমোক এ। ঘুম থেকে উঠে হালকা হাঁটাহাঁটি করতে বেরিয়ে পড়লাম, সঙ্গে করে লাকড়িও সংগ্রহ করে আনলাম। এবার দুপুরে রান্না হবে খেজুরের গুড় দিয়ে ফিরনি, সঙ্গে মুড়ি। রান্নাটা দারুণ হয়েছে। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে আবারও বেরিয়ে পড়লাম হাঁটতে। চারপাশে শিশুরা উচ্ছ্বসিত হয়ে খেলাধুলা করছে। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত এ কী অপূর্ব দৃশ্য! নিজের চোখে না দেখলে বোঝার উপায় নেই এতটা সুন্দর হতে পারে। এরপর এলো রাতের রান্নার পালা। বানালাম পোলাও আর ডিমের কোরমা। পেট ভরে খাওয়া শেষ করলাম। তারপর আবার জ্বালানো হলো আগুন, সবাই মিলে বসে রইলাম তারা দেখতে। পানিতে লুমিনাসের মতো আলোকিত প্রাণও দেখতে পেলাম এ রাতে। এভাবে সময় কাটছিল হঠাৎই মনে পড়ল, শিয়াল তাড়ানোর ব্যবস্থা করা দরকার, নাহলে আমাদের খাবার নিয়ে টানাটানি হতে পারে। রাত তিনটা পর্যন্ত আমরা তারা দেখলাম। আজ রাতে হরিণের ডাকও শুনেছি, যদিও হরিণ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। তবে প্রচুর শিয়াল আর ইঁদুর দেখেছি। দুই দিন আর দুই রাত যেন পিকনিকের মতোই কাটল বনের মধ্যে এই আয়োজন। পরদিন আমাদের ফিরতে হবে, তাই ঘুমানোর জন্য শুয়ে পড়লাম।

১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল সূর্যোদয় দেখার আগ্রহে। অপূর্ব সেই দৃশ্য আকাশ রাঙিয়ে উঠল আলোয়। তারপর সকালের নাস্তার জন্য আলু ও ডিম সিদ্ধ করে নিলাম। খাওয়া শেষে দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে, নৌকার মাঝিকে বলা হল যেন সকাল দশটার মধ্যে ঘাটে পৌঁছায়। আমরা প্রস্তুত হয়ে এগারোটার দিকে যাত্রা শুরু করলাম কচ্ছপিয়া ঘাটের উদ্দেশে। নৌকাপথে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাগল সেখানে পৌঁছাতে। কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে অটোরিকশা করে চলে গেলাম বেতুয়া ঘাটে। সেখানে দুপুরের খেলাম ভাত, ইলিশ মাছ, মুরগি আর হাঁসের মাংস দিয়ে। দ্রুত খাওয়া শেষ করে রওনা দিলাম লঞ্চে, কারণ ছাড়ার সময় সন্ধ্যা পাঁচটা। আমরা উঠলাম ‘ফারহান-৩’-এর ডেকে। চাদর পেতে শুয়ে পড়লাম। গল্প করতে করতে লঞ্চ ছাড়ল ঢাকার পথে। রাতের খাবার ছিল লঞ্চে ভাত, মুরগি আর ইলিশ মাছ দিয়ে। তারপর ঘুম ছাড়া আর কোন গতি ছিল না, শরীর আর মিলিয়ে দিচ্ছিল না চোখ।

পরের দিন, ১৭ ডিসেম্বর, ভোরবেলা ঢাকা সদর ঘাটে পা রাখলাম। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা চলে এলাম বাড়ির পথে।

এ ছিল খুব মজার, রোমাঞ্চে ভরা এক দুঃসাহসিক ভ্রমণ।

এটি ছিল ভোলার শেষ প্রান্তে একটি দুঃসাহসিক বনভোজন। ১৩ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে লঞ্চে যাত্রা শুরু করে ১৪ তারিখ সকালে বেতুয়া ঘাটে পৌঁছে, আমরা কচ্ছপিয়া ঘাট ও একটি নির্জন নারিকেল বাগানের উদ্দেশ্যে রওনা দিই। বনের মধ্যে তাঁবু স্থাপন করে আমরা দুটি দিন ও রাত কাটাই, যেখানে রান্না, তারা দেখা, সূর্যোদয়-অস্ত উপভোগ এবং স্থানীয় জীবজন্তুর সাথে সহাবস্থান ছিল দৈনন্দিন জীবন। ১৬ তারিখ আমরা ফেরত যাত্রা শুরু করি এবং ১৭ ডিসেম্বর ভোরে ঢাকায় ফিরে আসি।

পুরো অভিজ্ঞতাটি ছিল শহুরে জীবনের নিয়মিততা থেকে এক মুক্তিলাভ, প্রকৃতির কাছে আত্মসমর্পণ এবং একসাথে সময় কাটানোর এক অনবদ্য সুযোগ। এটি কেবল একটি ভ্রমণই ছিল না, বরং হৃদয়ে জমা রাখার মতো বহু অকৃত্রিম মুহূর্তের সমাহার, যা দীর্ঘদিন আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল থাকবে।

ভ্রমণকারীদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ভ্রমণ শুধু একটি স্থান দেখে আসাই নয়, এটি সেই স্থানের সাথে একটি সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে জীববৈচিত্র্যপূর্ণ পরিবেশে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপেই থাকা চাই দায়িত্বশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ।

১. মনে রাখবেন, আমরা এখানে শুধুই অতিথি: এই বন, এর নদী, এবং এর বাসিন্দা প্রাণীরা এখানে আমাদের চেয়ে বহু আগে থেকে বসবাস করছে। আমরা যেন আমাদের উপস্থিতি দিয়ে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন না ঘটাই।

২. স্মৃতি নিন, কিন্তু চিহ্ন রেখে যাবেন না: আপনার ক্যামেরায় অসংখ্য ছবি, মনের মাঝে অমলিন স্মৃতি সংগ্রহ করুন। কিন্তু প্লাস্টিকের মোড়ক, ব্যবহার্য বোতল বা কোনো কৃত্রিম বর্জ্য যেন প্রকৃতির বুকে চিহ্ন রেখে না যায়।

৩. স্থানীয়দের সম্মান ও নির্ভরতা: স্থানীয় মাঝি, গাইড এবং বাসিন্দাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা এই অঞ্চলে আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাদের পরামর্শকে গুরুত্ব দিন, তাদের পেশাকে সম্মান করুন।

৪. প্রস্তুতি মানে নিরাপত্তা: প্রকৃতির সাথে সাক্ষাৎ unpredictable। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আপনার অভিযানকে আনন্দদায়ক এবং নিরাপদ করবে।

৫. আপনার ভ্রমণকে অর্থপূর্ণ করুন: শুধু বেড়ানোর জন্য বেড়ানো নয়, এই ভ্রমণ হোক প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে শেখার একটি মাধ্যম। বনের প্রতি ভালোবাসা ও সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ যেন আপনার সঙ্গী হয়।

৬. ছোট দল, বড় প্রভাব: ছোট দলে ভ্রমণ পরিবেশের উপর চাপ কমিয়ে দেয়। তাই সম্ভব হলে বড় দলে না ভাগ হয়ে ছোট ছোট দলে ভ্রমণ করার চেষ্টা করুন।

সবশেষে, আমরা যেন এমনভাবে এই অঞ্চল থেকে বিদায় নেই যাতে পরবর্তী ভ্রমণকারীরা আমাদের আগমনের কোনো নেতিবাচক ছাপ না খুঁজে পায়, বরং প্রকৃতির অক্ষত সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারে।

ভ্রমণ শুভ হোক, নিরাপদ হোক এবং দায়িত্বশীল হোক।

Leave a Reply