যেখানে সময় থমকে দাঁড়ায় !

ভ্রমণ স্থানঃ নিঝুম দ্বীপ।

ভ্রমণসঙ্গিঃ Kazi Rakibul Hasan Md Abdullah Al Noman 

বিস্তারিত শুরু করার আগে নিঝুম দ্বীপ সম্পর্কে একটু বলে নেই। এরপর শেয়ার করবো নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের সম্পূর্ণ তথ্য ও আমাদের অভিজ্ঞতা।

নিঝুম দ্বীপ (22.05899941066896, 91.01201638864181) বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার অন্তর্গত একটি ছোট, শান্ত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা দ্বীপ। একসময় এটি চর ওসমান নামে পরিচিত ছিল। মেঘনা নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে জেগে ওঠা এই চরটি মূল ভূখণ্ড হাতিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। এটি কোনো একক দ্বীপ নয়; বরং চার পাঁচটি ছোট ছোট চর মিলেই গঠিত নিঝুম দ্বীপ।

শীতকাল এলে দ্বীপটি রূপ নেয় পাখির স্বর্গে। সরালি, জিরিয়া, লেনজা, পিয়ং, রাঙ্গামুড়ি, চখাচখি, ভূতিহাঁস, রাজহাঁস, কাদাখোঁচা, বাটান, গুলিন্দা, গাংচিল, কাস্তেচরা, পেলিক্যানসহ হাজারো অতিথি পাখির সমাগম ঘটে এখানে। স্থানীয় পাখির মধ্যে দেখা মেলে সামুদ্রিক ঈগল, বক এবং শঙ্খচিলের।

পাখি ছাড়াও দ্বীপজুড়ে রয়েছে হরিণ, বন্য শূকর, শেয়াল, বানর এবং নানান ধরনের সাপ যা নিঝুম দ্বীপকে করে তুলেছে আরও বৈচিত্র্যময় ও অনন্য।

এই ভ্রমণটা যেন ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিযান! জাহাজে ১২ ঘণ্টা মেঘনার বুক চিরে এগিয়ে চলা, তারপর ৩৫ কিলোমিটার সিএনজি যাত্রা, আর শেষে ট্রলার চড়ে নিঝুম দ্বীপে পা রাখা সব মিলিয়ে যাত্রার প্রতিটি ধাপই ছিল নতুন অভিজ্ঞতায় ভরা। পথ শুরু হয়েছিল ঢাকা সদরঘাট থেকে, গন্তব্য হাতিয়া হয়ে নিঝুম দ্বীপ। তিন দিনের এই পুরো ভ্রমণ যেন সময়কে এক জায়গায় থামিয়ে দিয়েছিল অপ্রত্যাশিত, অদ্ভুত আর রোমাঞ্চকর!

৬ নভেম্বর ২০২৫, দুপুর ১টার দিকে আমরা ১০ নম্বর মেট্রো স্টেশন থেকে মেট্রো ধরে মতিঝিল পৌঁছাই। সেখান থেকে অটো-রিকশায় সদরঘাট এ যেন ভ্রমণের প্রথম উত্তেজনা!

তাসরিফ-১ লঞ্চে চেপে হাতিয়ার উদ্দেশে রওনা দিই। লঞ্চের ভাড়া জনপ্রতি ৫০০ টাকা। রাতভর নদীপথ পাড়ি দিয়ে ৭ নভেম্বর সকাল ৭:৩০টায় পৌঁছে যাই তমরদ্দি লঞ্চ টার্মিনালে

সেখান থেকে ৭০০ টাকা ভাড়া দিয়ে সিএনজিতে ৩৫ কিলোমিটার ভাঙাচোরা রাস্তা পার হয়ে পৌঁছাই মোক্তারিয়া খেয়া ঘাটে। তারপর ট্রলার জনপ্রতি মাত্র ৫০ টাকা। ট্রলার থেকে নামতেই নিঝুম দ্বীপের হাওয়া যেন মুখে এক অন্যরকম অনুভূতি ছুঁয়ে দেয়।

দ্বীপে নেমে আবার অটো-রিকশা নিয়ে চলে এলাম নামার বাজার। পুরো যাত্রা মিলিয়ে ২০ ঘণ্টা পর, সকাল ১১:৩০টায় অবশেষে গন্তব্যস্থলে পৌঁছালাম।

পৌঁছে প্রথমেই আমরা নাস্তা করলাম পরোটা, ডিম ভাজি, সবজি। আগের রাতে লঞ্চে ছিল ভাত, রুই মাছের মাথা আর ডাল একদম দেশি স্বাদ।

নামার বাজারে একটি দারুণ সুন্দর বিচ আছে। আমরা সেখানে তাবুতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। জনপ্রতি তাবুর ভাড়া ৫০০ টাকা। পুরো বিকেল, সন্ধ্যা, রাত আমরা সেই বিচেই কাটালাম রিল্যাক্স, হাঁটাহাঁটি আর প্রকৃতি উপভোগ করে।

চারদিকে লাল কাঁকড়ার দৌড়ঝাঁপ, নরম বাতাস, আর ঢেউয়ের শব্দ সব মিলিয়ে দৃশ্যটা অবিশ্বাস্য সুন্দর। কিন্তু সবচেয়ে মনকাড়া মুহূর্ত ছিল সূর্যাস্ত লাল টকটকে রঙে আকাশ জ্বলছিল। ক্যামেরায় ধরা যায় না, শুধু মনের ভিতর জমে থাকে এমন দৃশ্য।

দুপুরে আমরা লোকাল হোটেলে খেলাম ভাত, কোরাল মাছ, চিংড়ি, ডাল আর ভর্তা ৩ জনে ৮৫০ টাকা বিল। রাতে নিজেরা রান্না করে খিচুড়ি আর ডিম ভাজা বানিয়ে নিলাম।

পূর্ণিমার আলোয় সাগরের ধারে শুয়ে তারা দেখতেই যেন পুরো রাত কেটে গেল। ভরা পূর্ণিমার সেই আলো তা সত্যিই ভুলবার নয়।

৮ নভেম্বরের সকাল নিঝুম দ্বীপে আরেকটি নতুন দিন। হালকা ঠান্ডা বাতাসে ঘুম ভাঙতেই মনে হলো, যেন প্রকৃতি নিজেই আমাদের ডেকে বলছে  “চলো, একটু হাঁটাহাঁটি করি।”

আমরা বিচের পাশ দিয়ে ধীরে হাঁটলাম, ভেজা বালুর ওপর পায়ের ছাপ রেখে, সকালের আলোয় কিছু মুহূর্তকে ছবিতে আটকে রাখার চেষ্টা করলাম।

তারপর আবার নাস্তার টেবিলে পরোটা, রসগোল্লা আর হাঁসের মাংসের গন্ধে morning mood যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

এরপর যাত্রা ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর। গাছের শেকড়, বাতাসের নীরবতা, আর দূরে হরিণের লুকোচুরি সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ। সৌভাগ্যবশত একদল হরিণ কাছে এল, আর আমরা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলাম হাতে চিপস নিয়ে ওদের ছোট্ট আনন্দ দেখতে।

দুপুর গড়াতেই জোয়ারের টান। ১২টার দিকে মাছের ট্রলারে উঠলাম, মেঘনার মোহনার জলে ৫ ঘণ্টার দীর্ঘ দোলায় ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম নোয়াখালীর চেয়ারম্যানবাড়ি ঘাটের দিকে। ভাড়া জনপ্রতি ৫০০ টাকা। কিন্তু অভিজ্ঞতা অমূল্য।

ঘাটে নেমে আবার সিএনজি যাত্রা ৩৫ কিলোমিটার, খোলা রাস্তার বাতাসে ভ্রমণের শেষ অংশটুকুর গল্প জমে উঠছিল। শেষে সোনাপুর বাসস্ট্যান্ড, সেখান থেকে নিরিবিলি বাসে উঠে পড়লাম ঢাকার উদ্দেশ্যে আরও ৫০০ টাকার টিকিট কেটে।

রাত গড়াতে গড়াতে যখন ঢাকায় ঢুকলাম, ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ২টা ছুঁই ছুঁই। শরীর ক্লান্ত ছিল  কিন্তু মন ভরা ছিল নিঝুম দ্বীপের হাওয়া, পাখির ডাক, হরিণের দৌড়, আর সাগর-চাঁদের সেই শান্ত স্মৃতিতে।

নিঝুম দ্বীপের এই তিন দিনের ভ্রমণ ছিল যেন সময়কে থামিয়ে দেওয়ার এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চে মেঘনার বুক চিরে এগোনো, ভাঙাচোরা পথ পাড়ি দিয়ে ট্রলার চড়ে দ্বীপে পৌঁছানো, তাবুর ভেতর সমুদ্র বাতাসের কাছে রাত কাটানো; লাল কাঁকড়ার রাজত্ব, রক্তিম সূর্যাস্ত আর পূর্ণিমার সাদা আলো আমাদের মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। একদিন পেরিয়ে সকালে হাঁটাহাঁটি, ম্যানগ্রোভ বনের নীরবতা, সামনে এসে দাঁড়ানো হরিণের দল, চিপস খেতে খেতে তাদের নির্ভার চোখ সব মিলিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে এক আন্তরিক বন্ধুত্বের মতো অনুভূতি। শেষে জোয়ারের স্রোত ধরে মাছের ট্রলারে দীর্ঘ নদীপথ, আবার সিএনজি ও বাসে ফেরা সব ক্লান্তির পরও যেন মনে হচ্ছিল, নিঝুম দ্বীপের নীরবতা, আলো ছায়া, আর সমুদ্রের নিঃশব্দ ডাক এখনও আমাদের ভেতরেই বাজছে।

🌿 ভ্রমণকারীরদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা: 

  • প্রকৃতিকে সম্মান করো তুমি অতিথি, প্রকৃতি নয়।
  • ময়লা ফেলো না, দ্বীপটাকে যেমন পেয়েছ তেমনই রেখে আসো।
  • বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করো না, তারা এখানকার প্রকৃত বাসিন্দা।
  • ভ্রমণে নম্র হও; মানুষ, পথ আর পরিবেশ সবাইকে শ্রদ্ধা করো।
  • সূর্যাস্ত, নীরবতা আর সমুদ্র এসবই শেখায় সত্যিকারের শান্তি।
  •  

Leave a Reply